ওরাকান্দির এতো কদর! কেন মোদির বাংলাদেশের ওরাকান্দি সফর?

Spread the love

দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে হঠাৎ ক্ষণিকের ঝড় তুলল ওড়াকান্দি। প্রায় পরাশক্তি হয়ে উঠতে চাওয়া ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে কেন বাংলাদেশের ওড়াকান্দি পর্যন্ত আসতে হলো? ইতিহাস কেন রাজনীতিকে বারবার এভাবে সমাজশক্তির মুখোমুখি হতে বাধ্য করে? ওড়াকান্দির শক্তির জায়গাটা কোথায়?

ওড়াকান্দি গোপালগঞ্জের কাশিয়ানীতে- এটা সকলেরই জানা। তবে দেশ-বিদেশের সবাই হয়তো এটা জানেন না- এত বিখ্যাত হয়েও এটা সাধারণ এক গ্রাম মাত্র। এখানেই জন্ম দুই ‘ঠাকুর’ হরিচাঁদ ও গুরুচাঁদের। হিন্দু নমশূদ্রদের সামাজিক জাগরণের সংগঠক তাঁরা। হরিনামে মাতোয়ারা হওয়ার সংস্কৃতি থেকে এই সম্প্রদায় নিজেদের চিহ্নিত করে মতুয়া হিসেবে। হরিচাঁদের জন্ম মার্চে। আরেক মার্চে সেখানে ঘুরে গেলেন নরেন্দ্র মোদি। তাঁর সফরসঙ্গীদের কষ্ট কমাতে নিভৃত ঐ পল্লীর রাস্তা-ঘাটে উন্নয়নের ধুম পড়েছিল কয়েকদিন। মসৃণ রাস্তা-ঘাট ছাড়াই যুগের পর যুগ হরিচাঁদ ও গুরুচাঁদের জন্মভিটা মতুয়াদের কাছে সর্বোচ্চ আবেগের জায়গা হয়ে আছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সেখানে আসাকে বিশ্ব মতুয়া সমাজ ঐ আবেগের স্বীকৃতি হিসেবেই দেখছিল। শ্রী চৈতন্যই হরি হয়ে এসেছিলেন- বিশ্বাস করে হরিচাঁদের অনেক ভক্ত। বৈঞ্চব সংস্কৃতির ভেতরই মতুয়াবাদের বিকাশ। বর্ণ বঞ্চনা থেকে উঠে দাঁড়াতে শিক্ষায় বিশেষ গুরুত্ব দিতেন হরি ও তাঁর পুত্র। হরিচাঁদ যে দর্শন গড়েন গুরুচাঁদ তাকেই প্রচার করেন। এদের মুক্তির-ধর্মতত্ত্বে শিক্ষার গুরুত্ব বিপুল। উচ্চবর্ণের বাধা পেরোতে হরিচাঁদ পুত্রকে শেষপর্যন্ত মুসলমানদের মক্তবে পাঠিয়েছিলেন। বার্তাটি ছিল স্পষ্ট: সকলকে শিক্ষিত হতে হবে। এভাবেই নমোদের উঠে দাঁড়ানোর পালা। বঙ্গে বর্ণবাদের বিরুদ্ধে কলকাতাকেন্দ্রীক রামমোহনদের সংগ্রাম গ্রামে সামান্যই প্রভাব ফেলেছিল তখন। পূর্ববঙ্গের বিশাল কৃষিসমাজে জাতপাতবিরোধী সেই সংস্কার আন্দোলন তৈরি করেন বিশেষভাবে এই বাবা-ছেলে। শিক্ষার বাইরে কৃষির বাস্তব সমস্যা এবং গৃহকর্মকে গুরুত্ব দিয়ে বঙ্গের নিম্নবর্গকে জীবনবাদী করে তুলেছিলেন এই দুই লোকশিক্ষক। এভাবেই খুলনা-যশোর-বাকেরগঞ্জ-ফরিদপুর-ঢাকা মিলে অতিসংঘবদ্ধ বিশাল এক নমশূদ্র বলয় গড়ে ওঠে একদা। অবহেলিত ঐ রেঁনেসার কথা বনেদি সমাজবিদদের বিশেষ মনযোগ পায়নি আজও। কিন্তু রাজনীতির অঙ্কে দক্ষ আরএসএস পরিবারকে তা না জানলে চলবে কেন। বাংলায় নমশূদ্রদের একটা বড় সামাজিক বৈশিষ্ট্য সম্প্রদায়গত যৌথতা। এই বলয়ে প্রথম ফাটল ধরে ভারত ভাগের আগে-আগে। ওড়াকান্দিতে তখন মূল ‘ঠাকুর’ গুরুচাঁদের নাতি প্রমথ রঞ্জন। তিনি ও বাকেরগঞ্জের যোগেন মন্ডল তখন বাংলার নমোদের প্রধান রাজনৈতিক স্তম্ভ। বয়সে মাত্র দু’ বছরের ব্যবধান উভয়ে। সুভাষ বসুর অনুসারী তাঁরা। দু’জনই ১৯৩৭-এর নির্বাচনে জিতেছেন তখন। চাইছেন ‘বঙ্গ’ এক থাকুক। কিন্তু ক্রমে যোগেন মুসলিম লিগের দিকে মৈত্রীর হাত বাড়ান। পি আর ঠাকুর এগোন কংগ্রেসের দিক। ‘দেশ’ভাগ ঠেকানো গেল না। পি আর ঠাকুর ওড়াকান্দি ছেড়ে কলকাতা গেলেন। যোগেন পাকিস্তানে। এভাবেই বাংলার তফসিলী ফেডারেশন ভাঙ্গে সেদিন।