কুমিল্লা দক্ষিনাঞ্চলের হাটে-বাজারে বিক্রি হচ্ছে অপরিশোধিত পানি

Spread the love

মশিউর রহমান সেলিমঃ কুমিল্লা দক্ষিনাঞ্চলের লাকসাম, বরুড়া, সদরদক্ষিণ, লালমাই, নাঙ্গলকোট ও মনোহরগঞ্জ উপজেলার বিভিন্নস্থানে ফিল্টারিং না করে নিয়ম বর্হিভুত ভাবে অপরিশোধিত পানি বিক্রির হিড়িক পড়েছে। চলমান মহামারী ভাইরাস করোনার প্রার্দুভাবও তাদের দমাতে পারেনি।
স্থানীয় একাধিক সূত্র জানায়, জেলা দক্ষিনাঞ্চলের স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, বিএসটিআই, পরিবেশ ও শ্রম দপ্তরসহ সংশ্লিস্ট অন্যান্য বিভাগের কোন রকম অনুমতি পত্র কিংবা প্রত্যায়নপত্র না নিয়েই ওই প্রতিষ্ঠানগুলো দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ এ পানির ব্যবসা চালিয়ে আসছে। তার উপর এ অঞ্চলে রয়েছে লাকসাম পৌরশহরে ৬/৭টি পানি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ছাড়াও বিভিন্ন কোম্পানীর বিশুদ্ধ পানির নামে বোতল, জার ও ক্যানতো আছেই। কোন কোন পানি তৈরী প্রতিষ্ঠান টিউবওয়েল থেকে প্লাষ্টিকের জারে পানি ভর্তি করে আর্সেনিকমুক্ত ও বিশুদ্ধ পানির নামে সরবরাহ করছেন এলাকার বিভিন্ন সরকারী ও বেসরকারী প্রতিষ্ঠানে।
সূত্রগুলো আরও জানায়, বিএসটিআই অনুমোদন নিতে হলে আইএসও গাইড-৬৫ অনুযায়ী প্রত্যোক প্রতিষ্ঠান পানি ভর্তি ও জার পরিস্কারে স্বয়ংক্রিয় মেশিন সংরক্ষিত, কেমিষ্ট, শীতাতাপ নিয়ন্ত্রনে কারখানার ল্যাবরোটরী স্থাপন ও শ্রমিকদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও স্বাস্থ্য সরঞ্জাম বাধ্যতামূলক। এ অঞ্চলে প্রায় ২ শতাধিক গ্রামে আর্সেনিক দুর্যোগ হিসাবে দেখা দিয়েছে। তার মধ্যে প্রায় ৭০টি গ্রাম আর্সেনিকের করাল গ্রাসে স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে রয়েছে। বিশেষ করে এলাকার প্রায় ৯৮ ভাগ টিউবওয়েল আর্সেনিকযুক্ত এবং প্রায় ৫৬ ভাগ টিউবওয়েল মলযুক্ত। এ পর্যন্ত লাকসামে ২৬ হাজার ও মনোহরগঞ্জে প্রায় ৩৫ হাজার, বরুড়ায় ১৫ হাজার, সদরদক্ষিনে ১৮ হাজার, লালমাইতে ১১ হাজার ও নাঙ্গলকোটে প্রায় ২০ হাজার লোকের উপর বিভিন্ন বেসরকারী সংস্থা আর্সেনিক গবেষণা এবং পর্যবেক্ষন করে চলেছে।
জেলা দক্ষিনাঞ্চলের একাধিক বেসরকারি সংস্থার সূত্র জানায়, জেলা-উপজেলা দক্ষিনাঞ্চলের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে এ পর্যন্ত লাকসামে প্রায় সাড়ে ৫ হাজার ও মনোহরগঞ্জে প্রায় ৪ হাজার, বরুড়ায় সাড়ে ৩ হাজার, সদর দক্ষিনে ৩ হাজার ৮’শ, লালমাইতে ২ হাজার ১’শ ও নাঙ্গলকোটে প্রায় ৪ হাজার ২’শ আর্সেনিক রোগী সনাক্ত করতে পেরেছে।
স্থানীয় একাধিক পরিবেশবিদ জানায়, ওইসব পানি তৈরী প্রতিষ্ঠানের প্রতারনার খপ্পরে পড়ে ভোক্তারাও পানির গুনগতমান বিচার ছাড়াই কথিত ওই ফ্লিটার পানিকে বিশুদ্ধ পানি ভেবে পান করে চলেছে। এছাড়া ওইসব প্রতিষ্ঠানের হালনাগাদ ট্রেড লাইসেন্স, আয়কর প্রত্যায়ণপত্র, কারখানা লে-আউট, প্রোসেসফ্লো-চার্ট, কারখানা স্থাপিত যন্ত্রপাতির তালিকা, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জীবন বৃত্তান্ত, স্বাস্থ্যসনদ, পরিবেশ সনদ, শ্রম মন্ত্রনালয় সনদ, স্বাস্থ্য সরঞ্জাম, প্রিমিসেস সনদ, বিডিএস ও মোড়কজাত করন বিধিমালা বাধ্যতা মূলক থাকলেও ওই প্রতিষ্ঠানের মালিকরা তা মানছে না। স্থানীয় সকল মহলকে ম্যানেজ করেই তাদের এ অবৈধ ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। এতে স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে এ অঞ্চলের কয়েকলাখ মানুষের।
স্থানীয় বেসরকারি হাসপাতালের চিকিৎসক বোর্ডের একাধিক সদস্য জানায়, ওইসব প্রতিষ্ঠান স্থাপনের পূর্বেই বিএসটিআই ছাড়পত্রসহ সংশ্লিষ্ট নিয়মে কাগজপত্র বাধ্যতামূলক। সংস্থার অধ্যাদেশ-৩৭/৮৫ এর ২৪ ধারা মতে পানিসহ প্রত্যেক পন্যের ছাড়পত্র নিতে হবে এবং পানি বাজারজাত করনে সংস্থার সিএম সনদ জরুরী । অপরদিকে প্রতি লিটার পানিতে উপাদান থাকতে হবে পিএইচ ৬.৪ থেকে ৭.৪, টিডিএস-২৬০ মিলিগ্রাম,ক্যাডসিয়াম .০০৩, লেড .০১, ক্লোরাইড-২৫০, নাইট্রেড ৩.৫ এবং আর্সেনিক ও সায়ালাইড গ্রহনযোগ্য নহে বিধান থাকলেও তাদের কাছে এসব মূল্যহীন।
অন্যদিকে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার মতে, প্রতি লিটার পানিতে গ্রহনযোগ্য উপাদানগুলো হলো আর্সেনিক ০.০৫ মিলিগ্রাম, ক্যালসিয়াম ৭৫, ক্লোরাইড-২০০, ক্যাডসিয়াম-০.০০৫, কপার-১, ক্লোরাইড-১, আয়রন ০.১-০.৩, লেড-০.০৫, মার্কারী-০.০০১, ম্যাগনেসিয়াম ৩০-৫০, ম্যাঙ্গানিজ ০.০৫, নাইট্রেড ১০.৪৫, পিএই ৭-৮.৫, সালফেট-২০০.০০,টিডিএস ৫০০, টোটাল হার্ডনেস ১০০ এবং জিংক ৫ মিলিগ্রাম। এছাড়া ওই পানি তৈরিতে ক্ষতিকারক নাইট্রেড, আর্সেনিক ও সায়ালাইড শোধন করা হয় না। উক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোতে কোয়ালিটি কন্ট্রোল ল্যাবরোটরী এবং দক্ষ জনবল না থাকলে সে পানি কখনই বিশূদ্ধ হবে না। এমনকি পানি জীবানু মুক্ত হলেও পানির লেড, আয়রন, ফ্লোরাইড ও আর্সেনিকের মান সঠিক ভাবে নির্ণয় করার বিধান থাকলেও সংশ্লিষ্ট পানি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে তা অনুপস্থিত।
এ ব্যাপারে জেলা-উপজেলা সংশ্লিষ্ট সকল দপ্তরের একাধিক কর্মকর্তার মুঠোফোনে বার বার চেষ্টা করেও তাদের বক্তব্য নেয়া সম্ভব হয়নি তবে এ নিয়ে ভোক্তাদের মিশ্র প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেছে।