কুমিল্লা দক্ষিনাঞ্চলে পলো দিয়ে মাছ শিকার যেন সৌখিনতা

Spread the love

মশিউর রহমান সেলিমঃ কুমিল্লা দক্ষিণাঞ্চলের লাকসাম, বরুড়া, লালমাই, নাঙ্গলকোট ও মনোহরগঞ্জ উপজেলা জুড়ে হারিয়ে যাচ্ছে সৌখিন মৎস্য শিকারীদের পলো দিয়ে মাছ শিকার। অতীতের মতো শীতের শেষ দিকে খাল-বিল-নদীতে পানি কমে গেলে দল বেঁধে গ্রামীন ঐতিহ্য পলো নিয়ে মাছ শিকারের দৃশ্য এখন আর চোখে পড়ে না। মাঝে মধ্যে কয়েকজন সৌখিন শিকারীকে পলো দিয়ে মাছ ধরতে দেখা যায়। অনেকে প্রাইভেট কার কিংবা মাইক্রো বাস হাঁকিয়ে লাকসাম ও মনোহরগঞ্জের জলাঞ্চলে খাল-বিল ও ডাকাতিয়া নদীতে মাছ শিকার করতে আসলে ওই সময় এলাকায় উৎসব মুখর হয়ে ওঠে পরিবেশ।
স্থানীয় একাধিক সূত্রে জানা যায়, এ ৫টি উপজেলার উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া ডাকাতিয়া নদীসহ সংযোগ খাল ও পার্শ্ববর্তী বিলগুলো এখন প্রায় পানিশূন্যের পথে। দেশীয় প্রজাতির মাছ নেই বললেই চলে। তারপরও বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা মাছ শিকারীরা পলো দিয়ে এসব এলাকার নদী-খাল-বিলে মাছ ধরায় নেমে পড়েন। লাকসামের ডাকাতিয়া নদী, চাইলতাতলী খাল, ফতেপুর-গাজিমুড়া খাল, চিলোনিয়া-বিপুলাসার খাল, শ্রীয়াং-মুদাফরগঞ্জ কার্জন খাল, বাইপাস-নরপাটি খাল, ফতেপুর-নাঙ্গলকোট খাল এবং মনোহরগঞ্জের মেল্লা খাল, ঘাগৈর খাল, দাঁড়াচো খাল, লৎসর-লক্ষণপুর খালসহ ডাকাতিয়ার সাথে সংযুক্ত শাখা খালে এখন চলছে পলোসহ নানাহ সরঞ্জাম দিয়ে মাছ ধরতে দেখা গুটি কতেক সৌখিন শিকারীকে। এ অঞ্চলে এক সময় শত শত লোকের মাছ শিকারকালে সমগ্র এলাকা উৎসব মুখর হয়ে উঠলেও তা আজ যেন শুধুই অতীত স্মৃতি।
মনোহরগঞ্জের সৌখিন মাছ শিকারী আবু জাহেদ, আবুল কালাম, আব্দুস ছাত্তার ও জামাল হোসেন জানান, বিগত ১০/১৫ বছর আগে এ অঞ্চলে মাইকিং করে বিভিন্ন স্থানে পলো দিয়ে মাছ শিকার করা হতো। নদী ও খালের দু’পাড়ে ভোর না হতেই হরেক রকম পণ্যের মেলা বসতো। আনন্দ-উল্লাসের মাধ্যমে হৈ-হুল্লোল ঝাঁকে ঝাঁকে পলো দিয়ে মাছ ধরতো যুব-বৃদ্ধসহ নানা বয়সের মানুষ। এ সুযোগে ছোট ছোট ছেলে-মেয়েসহ স্থানীয় মৎস্যজীবীরাও নেমে পড়তো মাছ ধরতে। নদী ও খালে হাঁটু পানি, কোথাও গলা পানি। মাইলের পর মাইল নদী-খালে হাজার হাজার মানুষ পলোসহ অন্যান্য সরঞ্জাম নিয়ে নামতো মাছ শিকারে। এখন আর ওইসব দেখা যায় না। তবে কিছু কিছু লোক এখনো অতীত ঐতিহ্য ধরে রেখেছে।
লাকসাম পূর্ব ও উত্তরাঞ্চলের মাছ শিকারী তসলিম হোসেন, মিনার মাহমুদ, রাসেল আহমেদ ও আলী আক্কাছ জানায়, এখন আর আগের মতো দেশীয় প্রজাতির মাছ পাওয়া যায় না। পর্যাপ্ত পানি না থাকায় নদী-খালে মাছ নেই। আগে দেশীয় মাছের মধ্যে বোয়াল, শৈল, গজার, আইড়, রুই, কাতল, চিতলসহ হরেক রকমের মাছ পাওয়া যেত। কিন্তু এখন ওইসব মাছ প্রায় বিলীন হয়ে গেছে। গত সপ্তাহে ডাকাতিয়া নদীতে হামিরাবাগ এলাকায় সারাদিন মাছ ধরতে গিয়ে একটা মাছও পাইনি। সদর দক্ষিণ উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা সৌখিন মাছ শিকারী আরব আলী, আমির হোসেন, কোরবান আলী ও আবদুস সামাদ জানায়, এ অঞ্চলের নদী-খালের মিঠা পানিতে সুস্বাদু মাছ ধরতে আগে আমরা বন্ধুরা মিলে কয়েক গ্রুপে মাছ ধরতাম। বর্তমানে মাছ তেমন না থাকায় এখন আর কেউ আসতে চায় না। বিগত ৮/১০ বছর আগে এ এলাকার নদী ও খালে সকাল গড়িয়ে সন্ধ্যা পর্যন্ত বিভিন্ন পেশার লোকজন শখ করে পলোসহ অন্যান্য সরঞ্জাম দিয়ে মাছ ধরতো। এ সময় তারা বাড়ি থেকে আনা খাবার খেতো নদীর পাড়ে বসেই। সারাদিন পলো দিয়ে ধরা হরেক রকমের মাছ পলোর ভিতরে কলাপাতা দিয়ে বেঁধে বিভিন্ন যানবাহনে দলে দলে বাড়ি ফিরতো শিকারীরা।
এ দিকে ৫ উপজেলার স্থানীয় জেলে সুধীর, বিপ্লব দাশ, মইন, আশ্রাফ হোসেন, নিখিল ও রবীন্দ্র জানায়, মেল্লা খালসহ ডাকাতিয়া নদীতে প্রতি বছর অনেক দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ আসতো পলো নিয়ে। তারা সাইকেল, রিক্সা, প্রাইভেট কার, মাইক্রোসহ বিভিন্ন যানবাহনে পলো বেঁধে নিয়ে আসতো। আবার কেউ আগের দিন এসে থাকতো নদী বা খালের পাড়ে তাঁবু গেড়ে কিংবা আশে পাশের আত্মীয়-স্বজনদের বাড়ীতে। সকাল হলেই এ সময় উৎসব মুখর হয়ে উঠতো এলাকার পরিবেশ কিন্তু এখন তা অনেকটাই অতীত। লাকসাম উপজেলা জলাঞ্চলের বেশক’টি গ্রামের বাসিন্দা আক্রাম আলী, মামুন মিয়া, সুলতান মাহমুদ, সিরাজুল ইসলাম ও আলী আজগর জানায়, গত শুক্রবার সকালে ডাকাতিয়া নদীসহ সংযোগ কয়েকটি খালে পলোসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম নিয়ে কয়েকটি ভাগ হয়ে সৌখিন মাছ শিকারী নামছিলো। সব মিলিয়ে এতে শ’তিনেক লোক অংশ নেয়। অনেকক্ষণ পলো মারার পর মাছ না পেয়ে অনেকেই হতাশ। অথচ কালের আর্বত্তে এখন আর সকল ঐতিহ্যের সাথে দেশীয় মাছ ধরার বাহন পলোও দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে।
অপরদিকে দেশীয় প্রজাতির মাছ সংরক্ষনে উপজেলা মৎস্য বিভাগের দায়িত্ব অতি মূখ্য হলেও তাদের নিরব দর্শকের ভূমিকায় এলাকার জনমনে উঠেছে হাজারো বির্তক। বিশেষ করে উপজেলা পাঁচটির বিভিন্নস্থানে যত্রতত্র অবৈধ ভাবে গড়ে উঠা মৎস্য হেচারী, বেড়িবাঁধ, জলাবদ্ধতায় পানি আটক, নদী সংযোগ খালগুলোর প্রবেশ পথ বন্ধ এবং উভয়পাড় জবরদখল, আবাদী কৃষি জমিতে মৎস্য চাষসহ নানাহ প্রতিবন্ধকতায় দেশীয় প্রজাতির মাছগুলো হারিয়ে যাচ্ছে। এছাড়া জেলা-উপজেলা মৎস্য দপ্তর ও উপজেলা মৎস্য প্রজনন কেন্দ্রটির কর্মকান্ড নিয়েও এলাকার জনমনে হরেক রকম কানাঘুষা হচ্ছে।
এ ব্যাপারে জেলা- উপজেলা মৎস্য দপ্তরের কর্মকর্তাদের কাছ থেকে কোন জবাব পাওয়া যায়নি। তবে ওই দপ্তরের একাধিক সূত্র বলছেন ভিন্ন কথা। বিশেষ করে বিগত ৮/১০ বছরের দপ্তরগুলোর কর্মকান্ড নিয়ে তদন্ত করলেই বের হয়ে আসবে অনেক অজানা তথ্য দাবী সংশ্লিষ্ট অনেকের।