টিকাদান কার্যক্রম নিয়ে মন্ত্রী, সচিব, ডিজিসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বৈঠক করছেন প্রতিদিনই।

Spread the love

আগামী ৭ ফেব্রুয়ারি থেকে সারাদেশে একযোগে গণটিকাদান কার্যক্রম শুরু করতে যাচ্ছে সরকার। এই কর্মসূচির আওতায় প্রতিদিন দুই লাখ করে মাসে ৬০ লাখ মানুষকে টিকাদানের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। সে অনুযায়ী দেশের সব জেলায় টিকা পাঠানো হয়েছে। কিন্তু টিকা পেতে আগ্রহ প্রকাশ করে গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত ৫০ হাজার ২৬০ জন ‘সুরক্ষা’ ওয়েবসাইটে নিবন্ধিত হয়েছেন। এ হিসাবে গতকাল ছিল সপ্তম দিন। এর আগে গত সোমবার ষষ্ঠ দিনে ৩০ হাজার ৮০০ মানুষ অ্যাপের মাধ্যমে নিবন্ধন করেছিলেন। সপ্তম দিনে আরও ১৯ হাজার ৪৬০ জন টিকা পেতে নিবন্ধন করলেন। তবে এই সংখ্যা যথেষ্ট নয় বলে মনে করছেন সংশ্নিষ্টরা। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, নিবন্ধন ছাড়া কেউ টিকা নিতে পারবেন না। অন্যদিকে, মানুষও নিবন্ধনে তেমন সাড়া দিচ্ছেন না। অনেকেই নিবন্ধন করতে পারছেন না। স্মার্টফোনও সব মানুষের হাতে নেই। এ অবস্থায় প্রতিদিন দুই লাখ মানুষকে টিকা দেওয়ার সরকারি লক্ষ্যমাত্রা অর্জন নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে। পুরো টিকাদান কর্মসূচি নিয়ে সরকার নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। তবে নিবন্ধন কার্যক্রম সহজ করাসহ একগুচ্ছ বিকল্প পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে সরকার।
প্রতিদিনই টিকাদান কার্যক্রম নিয়ে মন্ত্রী, সচিব, ডিজিসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা নিজেদের মধ্যে বৈঠক করছেন। আবার কখনও মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে ভার্চুয়ালি বৈঠক করে পরামর্শ দিচ্ছেন অথবা তাদের মতামত শুনছেন। মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারা টিকার নিবন্ধন নিয়ে সবচেয়ে বেশি শঙ্কা প্রকাশ করেছেন। তারা নিবন্ধন প্রক্রিয়া সহজ করার জন্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে দাবি জানিয়েছেন। কয়েকজন সিভিল সার্জন টিকা ব্যবস্থাপনা নিয়ে সরকারি পরিকল্পনা আরও পর্যালোচনা ও সংশোধনের দাবি করেছেন।
কেন সাড়া কম :নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দক্ষিণাঞ্চলের একটি জেলার সিভিল সার্জন সমকালকে বলেন, দেশের ৮০ শতাংশ মানুষ গ্রামে বসবাস করেন। কিন্তু টিকাদান কেন্দ্রের সর্বশেষ অবস্থান উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। গ্রাম ও প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের দূরত্ব ৮ থেকে ১২ কিলোমিটারের মধ্যে। আবার গ্রামের অনেক স্থানে নিবন্ধনের সুযোগ কম। এ অবস্থায় গ্রামাঞ্চলের মানুষ টিকা নিতে আগ্রহী নাও হতে পারেন। এ কারণে নিবন্ধন কম হচ্ছে।
মহানগরী এলাকার একজন সিভিল সার্জন জানান, দেশে প্রথমে করোনা চিকিৎসার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের টিকা দেওয়া হবে। এরপর পর্যায়ক্রমে সরকারি-বেসরকারি চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের টিকা দেওয়া হবে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ১০ লাখ ৫২ হাজার ২৭ জন চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের টিকার আওতায় আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। তারা সবাই নিবন্ধন করলেও এতদিনে ১০ লাখের বেশি নিবন্ধন হয়ে যেত। এরপর সরকারি-বেসরকারি চাকরিজীবীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার ১৫ ক্যাটাগরির ৬০ লাখ মানুষকে প্রথম ধাপে টিকা দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত আছে। কিন্তু তাতে সাড়া কম। এ বিষয়ে সংশ্নিষ্টদের গুরুত্ব দিতে হবে।
রাজশাহী বিভাগের এক সিভিল সার্জন বলেন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের ফোন নম্বর ও জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বর চেয়ে তাদের কাছে চিঠি পাঠানো হয়েছিল। ওই চিঠিতে বলা হয়, করোনাভাইরাসের টিকার জন্য ফোন নম্বর ও জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বর প্রয়োজন। এতে সবাই ধরে নিয়েছিল, টিকা নিতে কারও নিবন্ধন করতে হবে না। এটিও নিবন্ধন কম হওয়ার কারণ হতে পারে বলে মনে করেন তিনি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্বাস্থ্য বিভাগের এক কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, প্রথম ধাপে টিকা নেওয়ার জন্য তার পরিবারের চারজন সদস্য রয়েছেন। ৫৫ বছরের ঊর্ধ্বে থাকা মা-বাবা এবং তিনি ও তার স্ত্রী। এই চারজনের মধ্যে গতকাল পর্যন্ত তিনজনের নিবন্ধন সম্পন্ন করতে পেরেছেন। তার মায়ের এখনও নিবন্ধন করতে পারেননি। কারণ নিবন্ধন করতে গিয়ে সুরক্ষা নামের নির্ধারিত ওয়েবসাইটটিতে নানামুখী সমস্যা হচ্ছে। সাইটটি ধীরগতির। এ কারণে আপলোড নিতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় লেগে যায়। আবার অনেক সময় সব তথ্য দেওয়ার পরও নিবন্ধন নিচ্ছে না। এসব জটিলতার কারণে অনেকে নিবন্ধন করার আগ্রহ হারাচ্ছেন।
তবে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের অ্যাপ ও উদ্ভাবন প্রকল্পের প্রধান তারেক বরকতউল্লাহ বলেন, ওয়েবসাইটে কোনো ধীরগতি নেই। সাধারণ মানুষের মধ্যে নিবন্ধনে সাড়া কম। প্রতি ঘণ্টায় পাঁচ থেকে ছয়জন করে নিবন্ধিত হচ্ছেন। অনেকে নিবন্ধনের জন্য চেষ্টা করছেন। কিন্তু সঠিক ক্যাটাগরি নির্বাচন, বয়সসীমাসহ বিভিন্ন ভুল তথ্য দেওয়ার কারণে ওয়েবসাইট সাড়া দিচ্ছে না। এতে অনেকে মনে করছেন, ওয়েবসাইটে ধীরগতি হচ্ছে। এটি সঠিক নয়।
সহজ করা ও বিকল্পের তাগিদ :নিবন্ধন প্রক্রিয়া সহজ ও বিকল্প ব্যবস্থা রাখার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম সমকালকে বলেন, টিকাদানের প্রক্রিয়া দেখে মনে হচ্ছে, সরকার চাচ্ছে মানুষ আগ্রহী হয়ে টিকা নেবে। কিন্তু প্রক্রিয়াটি এত জটিল করে রাখা হয়েছে, যাতে মানুষ আগ্রহী হচ্ছে না। এখন সরকারের উচিত হবে মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছানো। প্রতিটি এলাকা ধরে নির্ধারিত দিনে মানুষকে আহ্বান করতে হবে। তাদের ফোন নম্বর ও এনআইডি নম্বর নিয়ে আসতে বলা হোক। তাদের নিবন্ধন করে সঙ্গে সঙ্গে টিকা দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। একই সঙ্গে পরবর্তী নির্ধারিত দিনে টিকা গ্রহণকারী ব্যক্তিদের হাজির হতে হবে। এভাবে প্রক্রিয়াটি সহজ করা হলে টিকদানে সফলতা আসবে।
চিকিৎসকদের শীর্ষ সংগঠন বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ডা. রশিদ-ই মাহবুব সমকালকে বলেন, যে প্রক্রিয়ায় নিবন্ধন করে টিকা নিতে হবে, তা অত্যন্ত জটিল। দেশের অধিকাংশ মানুষই নিজে নিজে ওয়েবসাইট কিংবা অ্যাপে গিয়ে নিবন্ধন করতে পারবেন না। আশঙ্কা হচ্ছে, এই নিবন্ধনের জন্য রাস্তার মোড়ে মোড়ে ল্যাপটপ ও কম্পিউটার নিয়ে মধ্যস্বত্বভোগীরা বসে যাবেন। নিবন্ধন প্রতি ১০০ থেকে ২০০ টাকা করে হাতিয়ে নেবে। সরকার তাদের এই সুযোগটি করে দিচ্ছে। কিন্তু টিকাকেন্দ্রে নির্ধারিত দিনে নিবন্ধন করে টিকার ব্যবস্থা করা গেলে ভোগান্তি কম হবে। একই সঙ্গে মানুষও আগ্রহী হবেন। সরকারকে বিকল্প ভাবতেই হবে। অন্যথায় টিকাদান কার্যক্রম সফল হবে না।
বিকল্প একগুচ্ছ পরিকল্পনা:করোনাভাইরাসের টিকা নিবন্ধনের জন্য ‘সুরক্ষা’ অ্যাপে সাড়া কম থাকায় সরকারের হাইকমান্ডও উদ্বিগ্ন। টিকাদান কর্মসূচি সফল করতে সরকার বিকল্প একগুচ্ছ পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে ইউনিয়ন তথ্যকেন্দ্র, কমিউনিটি ক্লিনিক ও ইউনিয়ন উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিবন্ধন বুথ চালু করা। একই সঙ্গে ওই সব বুথ থেকে টিকার জন্য নিবন্ধন করতে জনসাধারণকে উদ্বুদ্ধ করতে শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত মাইকিং করা হবে। একই সঙ্গে গণমাধ্যমে বিজ্ঞপ্তি প্রচার করা হবে।

সুত্রঃ সমকাল

পথিকটিভি/ এ আর